তাফসীরগুলোর বিভিন্ন বর্ণনা এ আয়াতটির অর্থ যথেষ্ট অস্পষ্ট করে তুলেছে। অন্যথায় কথাটি মোটেই অস্পষ্ট নয়, একেবারেই পরিষ্কার। প্রথম বাক্যাংশে বলা হয়েছে لَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ অর্থাৎ "তারা যেন নিজেদের সাজসজ্জা ও প্রসাধন প্রকাশ না করে।" আর দ্বিতীয় বাক্যাংশে الا শব্দটি বলে এ নিষেধাজ্ঞায় যেসব জিনিসকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মধ্যে যাকে আলাদা তথা নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে তা হচ্ছে, مَا ظَهَرَ مِنْهَا "যা কিছু এ সাজসজ্জা থেকে আপনা আপনি প্রকাশ হয় বা প্রকাশ হয়ে যায়।"
এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, মহিলাদের নিজেদের স্বেচ্ছায় এগুলো প্রকাশ ও এসবের প্রদর্শনী না করা উচিত। তবে যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় (যেমন চাদর বাতাসে উড়ে যাওয়া এবং কোন আভরণ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া) অথবা যা নিজে নিজে প্রকাশিত (যেমন ওপরে যে চারটি জড়ানো থাকে, কোনক্রমেই তাকে লুকানো তো সম্ভব নয় আর নারীদের শরীরের সাথে লেপটে থাকার কারণে মোটামুটিভাবে তার মধ্যেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে যায়) সেজন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন জবাবদিহি নেই।
এ আয়াতের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হাসান বসরী, ইবনে সীরীন ও ইবরাহীম নাখ্য়ী। পক্ষান্তরে কোন কোন মুফাসসির مَا ظَهَرَ مِنْهَا এর অর্থ নিয়েছেন— ما يظهره الانسان على العادة الجارية (মানুষ স্বাভাবিকভাবে যা প্রকাশ করে দেয়) এবং তারপর তারা এর মধ্যে শামিল করে দিয়েছেন মুখ ও হাতকে তাদের সমস্ত সাজসজ্জাসহ। অর্থাৎ তাদের মতে মহিলারা তাদের গালে রুজ-পাউডার, ঠোঁটে লিপস্টিক ও চোখে সুরমা লাগিয়ে এবং হাতে আংটি, চুড়ি ও কঙ্কন ইত্যাদি পরে তা উন্মুক্ত রেখে লোকদের সামনে চলাফেরা করবে। ইবনে আব্বাস (রা.) ও তাঁর শিষ্যগণ এ অর্থ বর্ণনা করেছেন। হানাফী ফকীহদের একটি বিরাট অংশও এ অর্থ গ্রহণ করেছেন। (আহকামুল কুরআন—জাস্সাস, ৩য় খণ্ড, ৩৮৮-৩৮৯ পৃষ্ঠা)
কিন্তু আরবী ভাষার কোন্ নিয়মে مَا يُظْهِرُ-কে مَا ظَهَرَ-এর অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে তা আমি বুঝতে অক্ষম। "প্রকাশ হওয়া" ও "প্রকাশ করার" মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, এবং আমরা দেখি কুরআন স্পষ্টভাবে "প্রকাশ করা" থেকে বিরত রেখে "প্রকাশ হওয়ার" ব্যাপারে অবকাশ দিচ্ছে। এ অবকাশকে "প্রকাশ করা" পর্যন্ত বিস্তৃত করা কুরআনেরও বিরোধী এবং এমন সব হাদীসেরও বিরোধী, যেগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে নববী যুগে হিজাবের হুকুম এসে যাবার পর মহিলারা মুখ খুলে চলতেন না, হিজাবের হুকুমের মধ্যে চেহারার পর্দাও শামিল ছিল এবং ইহরাম ছাড়া অন্যান্য সব অবস্থায় নেকাবকে মহিলাদের পোশাকের একটি অংশে পরিণত করা হয়েছিল।
তারপর এর চাইতেও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এ অবকাশের পক্ষে যুক্তি হিসেবে একথা পেশ করা হয় যে, মুখ ও হাত মহিলাদের সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ সতর ও হিজাবের মধ্যে জমিন-আসমান ফারাক। সতর মুহাররাম পুরুষদের সামনেও খোলা জায়েয নয়। আর হিজাব তো সতরের অতিরিক্ত একটি বিষয়, যাকে নারীদের ও গায়ের-মুহাররাম পুরুষদের মাঝখানে আটকে দেয়া হয়েছে — আর এখানে সতরের নয়, বরং হিজাবের বিধানই আলোচ্য বিষয়।
তথ্যসূত্র: তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন্ নূর, টীকা: ৩৫
